নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন
Network for People’s Action - BFP
খসড়া ঘোষণাপত্র
[এই ঘোষণাপত্রটি দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত আমলে নিয়ে আমাদের সংগঠনের/প্লাটফর্মের সাধারণ সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হবে। তার আগ পর্যন্ত এটি খসড়া ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচিত হবে]
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। গত পনের বছরে দেশে গুম, খুন, হামলা, মামলা ও হয়রানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মানবাধিকার লঙ্ঘন চলেছে প্রকাশ্যেই। একই সময়ে অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট, বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। উন্নয়নের নামে হয়েছে অবাধ দুর্নীতি ও পরিবেশ ধ্বংস। ভবন ধ্বস, অগ্নিকাণ্ড ও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অসংখ্য মানুষের। এসবই ছিল কাঠামোগত সহিংসতার বাস্তব চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্বৈরতান্ত্রিক মতাদর্শের হাতিয়ার বানানো হয়। নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব কারণ মিলেই জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়। কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন জুলাই মাসে নতুন মোড় নেয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে সহস্রাধিক নাগরিক নিহত হন। এই রক্তপাতই আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে দলবলসহ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে হয়।
"জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের মানুষের জুলুম, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়েরই ধারাবাহিক রূপ। এটি একই সঙ্গে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার স্বাভাবিক প্রকাশ।"
পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ অসংখ্য নদীতে প্লাবিত এই ব-দ্বীপ উর্বর মাটি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডের মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব এক জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছে। নদীনির্ভর ভৌগোলিক বাস্তবতা এখানকার মানুষের সামাজিক গঠন, উৎপাদনব্যবস্থা, ধর্মীয় চর্চা, জীবনদর্শন ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভেতরে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন ও জীবনবোধের একটি স্বাভাবিক মিশেল দীর্ঘকাল ধরে গড়ে উঠেছে।
এই আবহমান জীবন ও সমাজব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা আসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। প্রায় দুশো বছরের শাসনে তারা বাংলার জমিন নিংড়ে সম্পদ লুট করেছে। একের পর এক দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা গেছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে অনুগত সামাজিক শ্রেণি তৈরি করেছে এবং শাসনের উপযোগী আইনকানুন চাপিয়ে দিয়েছে।
এই শাসন একদিকে বাংলার স্থানীয় শিল্প, সমাজনীতি, রাজনীতি ও দর্শনের স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সামাজিক সম্প্রীতি ও পার্থক্যকে বিদ্বেষে রূপ দেয়। এর মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা হয়। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর অনাস্থা ও বিভেদের বীজ তখনই রোপিত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই ভূখণ্ডের মানুষ নানা কায়দায় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ গড়ে তুলেছিল। ইতিহাসজুড়ে একের পর এক আন্দোলন ও বিদ্রোহে তারা শাসনের অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করেছে। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, চুয়াড় বিদ্রোহ, পাগলপন্থী আন্দোলন, বারাসাত বিদ্রোহ, ফরায়েজি আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিপাহী বিপ্লব, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ তারই উদাহরণ। এরপর এসেছে মুল্লুকে চলো আন্দোলন, সলঙ্গা গণহত্যা, তেভাগা আন্দোলন, টঙ্ক আন্দোলন, নাচোল বিদ্রোহ ও নানকার বিদ্রোহ। এসব লড়াইয়ে এই জনপদের রক্তে মাটি বারবার রঞ্জিত হয়েছে।
উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আন্দোলনও ছিল এই অঞ্চলের মানুষের আরেকটি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। বরং নতুন রাষ্ট্রটি দ্রুতই এক ধরনের ঔপনিবেশিক রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান জনগণের মুক্তির বাহন না হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন সেখানে ঘটেনি।
এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে আবারও আন্দোলনে নামে এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯৪৮-১৯৫০ সালের জমিদার প্রথা উচ্ছেদের কৃষক বিদ্রোহসমূহ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এসব আন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রামের সবচেয়ে উচ্চতম মুহূর্ত।
অগণিত মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মাত্র পঁচিশ বছরের ব্যবধানে দুটি রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার সঙ্গে এই জনপদের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ তাদের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক তৎপরতারই স্পষ্ট স্মারক। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেলেও খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয় যে সেই রাষ্ট্রের কাঠামো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বদলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল এবং সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের পথ খুলে দেয়া হয়।
সংবিধানে বলা হয়, সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। বাস্তবে দেখা যায়, সেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয় একজন ‘সুপ্রিম লিডার’-এর হাতে। পরবর্তীতে একের পর এক জনবিরোধী সংশোধনীতে জনমানুষের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হয়। ক্ষমতাকে আরো কুক্ষিগত করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঔপনিবেশিক আইনকাঠামো। এই মিলন থেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি ফ্যাসিবাদী কাঠামো গড়ে ওঠে। এই কাঠামো গত ৫৪ বছরে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ বারবার ব্যাহত করেছে। যিনি ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁকে শান্তিপূর্ণভাবে নামানোর কোনো টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে নানা অজুহাতে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রাণের অধিকারকে বিপন্ন করে তুলেছে।
নাগরিকদের বেঁচে থাকার সহজাত অধিকারের করুণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও পুলিশি সহিংসতার ঘটনায়। কখনো এসবের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ক্রসফায়ার’, কখনো ‘অভিযান’, কখনো ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’।
১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচার পতন ঘটলেও গণতন্ত্রের পথে যাত্রা মসৃণ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রাই গভীর হয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতাতেই পনের বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনক্ষমতার চূড়ান্ত রূপ প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ। গুম, ক্রসফায়ার, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞ, ভিন্নমতের চিন্তক ও লেখকদের ধারাবাহিকভাবে হত্যা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, এমনকি মত প্রকাশের কারণে সাধারণ জনতার বিরুদ্ধে গণহারে মামলা, আইনি হেফাজতে হত্যার মতো ঘটনাগুলো ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর ভয়াবহ বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর সুফল ভোগ করে সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের শুরুতেই এই বৈষম্যের বীজ রোপিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্তকরণের নামে ক্ষমতাসীন দলের অবাধ লুটপাট, মজুতদারি ও চোরাচালান দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
উৎপাদনমুখী শিল্প গড়ে তোলার পথে না গিয়ে দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল অর্থনীতি গড়ে ওঠেনি। বরং সাহায্য, অনুদান ও ঋণনির্ভর একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈষম্যমূলক উন্নয়ন ধারণা, যা অল্প কিছু মানুষের লাভ নিশ্চিত করলেও সাধারণ মানুষের জীবন বদলাতে পারেনি। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথ দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর সরাসরি ফল হিসেবে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং অসংখ্য অভুক্ত মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারায়।
স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় পুঁজির সুস্থ বিকাশ ঘটেনি। বরং যে পুঁজিপতি শ্রেণি গড়ে ওঠে, তারা চরিত্রগতভাবেই লুটপাটকারী, দুর্নীতিবাজ ও দস্যু-দখলবাজ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে শিল্পপুঁজি কিছুটা গড়ে উঠলেও এই শ্রেণির মৌলিক চরিত্র বদলায়নি। চরম মুনাফালোভের কারণে তারা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও ভাতা থেকে বঞ্চিত করেছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি। সংগঠিত হওয়ার অধিকারও ধারাবাহিকভাবে দমন করা হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষক সমাজ রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাবে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য তাদের আরও কোণঠাসা করে তোলে। উচ্চ উৎপাদন খরচের বিপরীতে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা কৃষিজমির মালিকানা হারাতে শুরু করে।
কৃষিভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বিপুল জনগোষ্ঠীর খুব অল্প অংশই আনুষ্ঠানিক শিল্পখাতে কাজের সুযোগ পায়। অধিকাংশ মানুষ ভূমিহীন কৃষক, বর্গাচাষী বা দিনমজুর হিসেবে টিকে থাকার সংগ্রামে নামে। কেউ জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হয় এবং নানা অনানুষ্ঠানিক পেশা, কাজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হয়। আবার কেউ প্রবাসে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়।
যে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় যোগান দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। রেমিটেন্স আয়ের পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায় প্রবাসী শ্রমিকদের লাশ হয়ে দেশে ফেরার নির্মম বাস্তবতা।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে। কিন্তু এই খাতের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা সুরক্ষা নেই। বরং রাষ্ট্রের বিমাতাসুলভ ও নিপীড়নমূলক আচরণে এখানকার শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম নাগরিক ও মানবিক অধিকারও স্বীকৃতি পায় না।
বিগত পনের বছরে দেশে একটি লুটপাটনির্ভর অর্থনীতিব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট হয়েছে। জ্বালানি খাতে ঘটেছে নজিরবিহীন দুর্নীতি। পুরো রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি মাফিয়াতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
উন্নয়নের শ্লোগান ব্যবহার করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একের পর এক বৈষম্যমূলক চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পশ্চাদযাত্রায় ভারতের নেতিবাচক ভূমিকার কথাও আজ আর অজানা নয়।
গত ৫৪ বছরের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এমন এক রাষ্ট্র পেয়েছি, যা কেবল শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ এবং ধর্মীয়, জাতিগত ও লিঙ্গীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার অস্বীকার করেনি, বরং নাগরিক হিসেবে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে।
এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে বারবার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষার আন্দোলন হয়েছে। উন্মুক্ত কয়লাখনির বিরুদ্ধে ফুলবাড়িতে মানুষ দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। সুন্দরবনসহ প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে মানুষ রাজপথে নেমেছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। নো-ভ্যাট আন্দোলন, কোটাসংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনও সংগঠিত হয়েছে।
এই সব আন্দোলন আসলে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েরই প্রকাশ। এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ফল হিসেবেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটে যায় সেই গণ-বিস্ফোরণ।
জুলাইয়ের পথ
জুলাই আমাদের সামনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে হাজির করে। জুলাই কেবল শাসক পরিবর্তনের ঘোষণা ছিল না। এটি ছিল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের দাবি নিয়েই জুলাই আমাদের সামনে এসেছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও দেড় বছর পর এসে বাস্তবতা হতাশাজনক। একই সঙ্গে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা আজ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভাষা ও চর্চার পুনরুত্থান। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার যে গণতান্ত্রিক ধারণা, তার গুরুতর লঙ্ঘন ঘটছে। ধর্মীয়, জাতিগত ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই কোনো না কোনোভাবে নারী, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচারমূলক আচরণ করছে।
গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করেও বাস্তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের উত্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। তবু প্রাণাধিকার ও মানবাধিকার আজও নিশ্চিত করা যায়নি। অভ্যুত্থানের পরও আমরা দেখেছি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নাগরিকের রক্ত ঝরছে।
এর পাশাপাশি নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অভিব্যক্তির ওপর বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠীর আক্রমণ বাড়ছে। এসব ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে, যারা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দেবে। যারা নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে মনোযোগী হবে।
এই প্রেক্ষাপটেই জনগণের শক্তি, আগামীর মুক্তি গড়ে তোলার প্রত্যয়ে আমরা যাত্রা শুরু করছি।
মূলনীতি
আমাদের রাষ্ট্রপ্রকল্প, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দাবিদাওয়া প্রণয়ন, পাশাপাশি সংগঠনের কাঠামো ও পরিচালনা পদ্ধতির ভিত্তি হবে পাঁচটি মূলনীতি। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সম্পর্ক নির্ধারণেও এই নীতিগুলোই দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
গণতন্ত্র
গণতন্ত্র সংখ্যাগুরুর স্বেচ্ছাচার নয়, বরং সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বরের সুরক্ষা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
সাম্য
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ ও অধিকার।
মানবিক মর্যাদা
রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আত্মমর্যাদা ও সম্মানের স্বীকৃতি।
সামাজিক ন্যায়বিচার
আইনের শাসন এবং প্রান্তিক ও ক্ষমতাহীন মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা।
প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষা
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়া।
এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে আমরা দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাই। আমরা তাদের সংগঠিত করতে চাই এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় তাদের ন্যায্য দাবি ও আন্দোলন–সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতে চাই।
যেসব অ্যাক্টিভিস্ট ও সংগঠন এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মধ্য থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চাই। আমরা সেই শক্তির রূপরেখা, কাঠামো ও রাজনৈতিক কর্মসূচি যৌথভাবে চূড়ান্ত করতে চাই।
আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের জনগণের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, যা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেবে। একই সঙ্গে এই শক্তি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।